সোমবার, ২৫ জুন, ২০১২

শিল্পকর্ম তৈরির একটা গোপন কৌশল




ছবি আঁকার আগে শিল্পী হৃদয়ে একটা চিত্র এঁকে ফেলেন। প্রায়সই দেখা যায় ক্যানভাসে আঁকা শেষে অন্য একটা কিছু দাড়িয়ে গেছে। কখনও কখনও শিল্পী নিজেই তা দেখে চমকে ওঠেন।

(আমি সেরকম কোন শিল্পী না হলেও লেখার ভেতর এমন কিছু হতে পারে তা টের পাইলাম আজ। কি লিখতে বসে এটা কি লিখলাম।)

আমি চিন্তা করছিলাম মিনিয়েচার নিয়ে কিছু লিখব। কিন্তু একটা ছবি দেখে মনে হল, শিল্পী কেন এভাবে আঁকেন? নেটে গুতোগুতি করে যা পাইলাম তা এরকম।

সৌন্দর্য ব্যাপারটার সাথে ভাল লাগা জড়িত। প্রশ্ন হল একটা শিল্পকর্ম কেন ভাল লাগে?

এই ভাল লাগার জন্য শিল্পী তার কাজে কিছু কৌশল অবলম্বন করেন। অনেক কৌশলের ভেতর একটা গোপন টেকনিক হচ্ছে গোল্ডেন রেসিওর ব্যবহার। গোল্ডেন রেসিও সম্পর্কে আমরা কম-বেশি সবাই জানি। প্রকৃতিতে এর ভুরি ভুরি উদাহরণ আছে।

তবে আর্টে এই রেসিওর ব্যবহার প্রাচীনকাল থেকে চলে আসছে। শিল্পী এমনভাবে আঁকেন যেন তার শিল্পকর্ম দর্শককে বলে, আমি তোমাকে দেখাতে চাইনা কিন্তু তুমি আমাকে মুগ্ধ হয়ে দেখো।

এই যে লুকোচুরি খেলা, এটা সার্থকভাবে শিল্পকর্মে ফুটিয়ে তোলার জন্য শিল্পী গোল্ডেন রেসিওর ব্যবহার করে থাকেন।



যারা ডানহাতি আর্টিস্ট তাদের ছবিতে ডান পাশে মূল কেন্দ্রবিন্দু চলে আসে হৃদয় থেকে। তবে শিল্পী ইচ্ছাকৃত এই মূল বিন্দুকে বিভিন্ন স্থানে বসিয়ে নিরীক্ষা করে থাকেন।



প্রকৃতিতে এই ফিবনাক্কি মজাটা অনেক রয়েছে। এতে সৌন্দর্য্যের মনিমুক্তা আমাদেরকে মোহিত করে।



মোনালিসা আঁকতে গিয়ে ভিঞ্চি এই সূত্র প্রয়োগ করেছিলেন বলে কোথাও উল্লেখ দেখা যায় না।

কিন্তু এখানে কেউ সেটা বসিয়ে ভাব নিয়েছে, দেখো.. মোনালিসা এত সুন্দর লাগার পেছনে এই হচ্ছে রহস্য।

হাহাহা...আসলে এটা মজা হলেও ছবিটাতে মূল বিন্দু থেকে ছড়িয়ে পড়ার ভেতর যে পারস্পরিক সম্পর্ক থাকে, যেমন টেনশন বা প্লাস্টিসিটি যাই বলিনা কেন, তা কিন্তু খুবই গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। একাডেমিক শিক্ষায় আমরা যা শিখি, পরবর্তি মুক্ত জীবনে এসে শিল্পের সেই উপকরনগুলো মনের অজান্তেই প্রয়োগ হতে থাকে।

মডার্ণ আর্টিস্টদেরকে এই গোল্ডেন রেসিও প্রভাবিত করে বিভিন্নভাবে। জোসেফ স্তেলা(J o s e p h S t e l l a
) সাম্প্রতিক এরকম কিছু কাজ করেছেন। একে তিনি ফিবোনাক্কি সিরিজও বলেছেন।



বাংলাদেশে আর্টিস্টরা এরকম কাজ করেছেন। চারুকলায় গেলে তা দেখা যায়। এটা একটা কমন বিষয়। তেমনি ক্যালিগ্রাফি পেইন্টিংয়েও এটা দেখা যায়। আজ এরকম একটি কাজ আমার নজরে পড়ল। ক্যালিগ্রাফার মোহাম্মদ আবদুর রহীমের 'ঐক্য' নামে একটি ক্যালিগ্রফি পেইন্টিং দেখেন।



এক্রিলিকে করা এ পেইন্টিংটাতে একটি ঘরের আকৃতিতে 'আল্লাহ' লেখা। ক্যালিগ্রাফার হয়ত বুঝাতে চেয়েছেন ঐক্যের মূল বিন্দু বা ফোকাস আল্লাহ হতে পারেন। আবার এটা কাবা ঘরের মত মনে হতে পারে, কাবা মুসলমানদের ঐক্যের প্রতিক। যাইহোক, আসলে এটাতে মূলবিন্দুকে উপস্থাপণের ব্যাপারে ফিবোনাক্কি বা গোল্ডেন রেসিও থিউরির একটা প্রভাব দেখা যায়।



তার আরেকটা ক্যালিগ্রাফি 'সাব্বিহিসমা রব্বিকাল আলা' সুলুস শৈলিতে করা। এখানে ক্যালিগ্রাফি পড়ার শুরুটা দেখানো আছে। আসলে ওটাই হচ্ছে ক্যালিগ্রাফির মূল ফোকাস বিন্দু। মজার বিষয় হচ্ছে, এতেও গোল্ডেন রেসিওর প্রভাব রয়েছে বলে মনে হয়।

আজ এই পর্যন্ত।

ছবি- নেট থেকে।

শনিবার, ২৩ জুন, ২০১২

পাখি...... আয় ফিরে আয় (উৎসর্গ বিভা)




দুই.
তুলো মেঘ ছুঁয়ে তোর আর কত সুখ
এই বুকে দেখ কত মেঘ ভরা দুখ
জ্যাকসন হাইট্স কি স্বপন ভূমি
ওরে এই মধুমতি তোরই সুখ-দুখ



তিন.
বাঁশবাড়ি গাঁয় এক সুকপাখি গায়
বিমর্ষ বাতাস শুধু হাহাকার তোলে
চাতকের বুক ফাটে নিদ্রাহার ভোলে
আরতো পারিনা পাখি আয় ফিরে আয়






ছবি- নেট থেকে

কাজল দিঘীর টানে....(উতসর্গ বিভা)



এক.
ভোরের হাওয়া পালিয়ে এসে গুবাক সারির মাঝে
উতল হল শিরীন নামের দস্যি মেয়ের সাজে
সুকসারিদের জটলা কেন, কে দেয় মনে দোলা
আনমনে এক কিশোর মনে নকশি রুমাল তোলা
---------------



চার.
তার কাজল চোখের দিঘীতে একদিন উঠেছিল ঢেউ
তারপর কত যে ফাগুন গেল, সর্ষে খেতের হলুদ গানও
সন্ধ্যা তারার টুপ করে ঝরে পড়া আর সোনালি বিকেল
এখানে বিবর্ণ আকাশ কেন বসে বসে মনে করে কেউ




ছবি- নেট থেকে...

বৃষ্টিবেলা





আঁধার ঘনায়ে আসিছে....মেঘ করেছে খুব ভারি
ওরে ঘরে ধান তুলে নে এইবেলা তাড়াতাড়ি
আদুরির বাছুর ডাকাডাকি করে ঝপ করে দেয়া নামে
সেদিন কোথায় হারাল জানিনে হৃদয়ের কোন খামে







ছবি-নেট থেকে

মিনিয়েচার আর্ট : শিল্প আধ্যাত্মের সম্মিলন




মিনিয়েচার। আর্টের একটি গুরুত্বপূর্ণ শাখা।

ছোট ছবি কিন্তু তাতে রয়েছে ঐতিহ্যের ছোঁয়া। সম্পূর্ণ নিজস্ব আইডেন্টিটি হচ্ছে মিনিয়েচার আর্টের অন্যতম মূল বৈশিষ্ট্য। মিনিয়েচার আর্টে প্রাচ্যকলা স্বমহিমায় উদ্ভাসিত। পাশ্চাত্য এ শাখায় জৌলুস হারিয়ে এখন দীনহীন টিমটিম করে জ্বলছে।

এখন মিনিয়েচার আর্ট আবার পুনর্জীবন ফিরে পেতে চলেছে। বিশেষ করে ইসলামিক মিনিয়েচারে কোন কোন সরকার প্রমোট করছে।

পাশ্চাত্য মিনিয়েচার আর্ট

পশ্চিমা বিশ্বে মিনিয়েচার আর্ট বেশি দিনের পুরনো নয়। ১৩ শতকের শেষ ভাগ থেকে মিনিয়েচার আর্ট হতে থাকে। বলা যায়, প্রাচ্যকলার এই গুরুত্বপূর্ণ শাখা থেকে অনুপ্রেরণা পেয়ে পশ্চিমা শিল্পীরা এটা করতে শুরু করেন। মূলত তারা পোট্রেট মিনিয়েচার আঁকতেন।


Jean Fouquet, self portrait in 1450

উইকিতে এটাই প্রাচীন নমুনা হিসেবে পাওয়া গেছে।


Portrait Miniature of Margaret Roper. Bodycolour on vellum mounted on card, 4.5 cm diameter, c. 1536

নিউ ইয়র্কের মেট্রোপলিটান মিউজিয়াম অব আর্টে সাড়ে চার সেন্টিমিটার বৃত্তের এই মিনিয়েচার আর্ট সংরক্ষিত।


Miniature painting (A Bacchante), 1799

দিনে দিনে পাশ্চাত্য শিল্পীরা এ শাখায় ভালই উন্নতি করে।



প্রাচ্যকলার সুক্ষ্ম প্রভাব রয়েছে এই পাশ্চাত্য মিনিয়েচারটিতে।


woman-black-dog. Terry Furchgott

সম্প্রতি মার্কিন আর্টিস্ট টেরি ফারগট যে মিনিয়েচার আঁকছেন তাতে প্রাচ্যকলার মিনিয়েচারের প্রবল প্রভাব রয়েছে।


Terry Furchgott


প্রাচ্যকলার মিনিয়েচার

প্রাচ্যকলায় মিনিয়েচার অসাধারণ এক দক্ষতা আর নিপুনতার স্মারক। হাজার বছর ধরে এই শিল্প উৎকর্ষতার এমন এক পর্যায়ে এসে পৌছেছে, যাতে শিল্পের সুক্ষ্ম রস আধ্যাত্মিকতার অনুভবে গিয়ে মিশেছে। শিল্পী তার তুলিকে এত সুক্ষ্ম আর নিখুঁত করে চালিয়েছেন যেখানে আতশি কাচ দিয়ে এর বিশ্ময়কর আঁচড় দেখে অভিভূত হতে হয়।



বাদশাহ আকবরের জন্য এ মিনিয়েচারটি করা হয়েছিল।




মজার একজোড়া গাছের মিনিয়েচার। বলা যায়, দম্পতি।




লাল গালিচা সংবর্ধনা

মিনিয়েচারে প্রতিকের ব্যবহার

মিনিয়েচারে দর্শন এসেছে ক্ষমতা আর জৌলুসের বার্তা নিয়ে। ক্ষমতাসীনরা শিল্পকলায় বরাবর তাদের মহাত্ম আর গৌরব প্রকাশ করতে সুপ্ত বাসনা লালন করেছেন। শিল্পীরা সেই সুযোগটা কাজে লাগিয়ে রাজসভায় উচ্চপদ বাগিয়েছেন।



এটাকে বলে শামসী। অর্থাৎ সূর্য। শক্তির এই প্রতীক কত নান্দনিক হয়ে ফুটে উঠেছে এখানে।

ইসলামিক মিনিয়েচার
মুসলিম বিশ্বে এখন মিনিয়েচার করা হচ্ছে ভিন্ন আঙ্গিকে। এতে প্রাণীচিত্রকে সচেতনভাবে এড়িয়ে যাওয়া হচ্ছে।



হাশিয়া




শামসী



দুয়া



হাশিয়া ও দায়েরাহ


বাংলাদেশে মিনিয়েচার

বাংলাদেশে মিনিয়েচার আর্ট আসে মোগলদের হাত ধরে। কিন্তু সে ধারা অব্যাহত থাকেনি। এখন নতুন করে আবার মিনিয়েচার আঁকা শুরু হয়েছে। ক্যালিগ্রাফির সাথে মিনিয়েচার আঁকার বিষয়টি ওৎপ্রোতভাবে জড়িত। বাংলাদেশের ক্যালিগ্রাফি অঙ্গনে খ্যাতনামা ক্যালিগ্রাফার মোহাম্মদ আবদুর রহীমের মিনিয়েচার এবং হাশিয়া (বর্ডার আর্ট) দেশে-বিদেশে সুনাম কুড়িয়েছে।

তার কয়েকটি মিনিয়েচার:



মহামহিম পরওয়াদেগার



আয়তাল কুরসি

আলজেরিয়া মিনিয়েচার ফেস্টিভালে এ দু'টো শিল্পকর্ম প্রশংসা পেয়েছে।

তার সাম্প্রতিক আরেকটি মিনিয়েচার শিল্পকর্ম


শামসী



অসীমের অনুভব


মিনিয়েচার আর্ট হচ্ছে আবেগ ও চরম ধৈর্যের সম্মিলন। যারা এটা করেন তাদের এটাতে এতই মগ্ন হতে হয় যে পৃথিবীর কোন খবর তাদের কাছে থাকে না। এটা আসলেই শিল্প আধ্যাত্মের এক অপূর্ব সম্মিলন।


ছবি-নেট থেকে

বৃহস্পতিবার, ৩১ মে, ২০১২

কাতিব আল-কুরআন থেকে ক্যালিগ্রাফার.....এক




হাল ইয়াসতা উইল্লাজিনা লা ইয়া'লামুনা অল্লাজিনা লা ইয়ালামুন



যারা জানে আর যারা জানে না উভয় কি সমান? [সুরা যুমার(৩৯)-এর ৯নং আয়াতাংশ]

কুরআনের কাতিব কিংবা ক্যালিগ্রাফাররা কুরআন লিপিবদ্ধ করেন এবং কুরআনের লেখন নীতিমালা(রসমুল কুরআন) এবং বানান নীতিমালা(ইমলাউল কুরআন) শতভাগ অনুসরন করেনএজন্য তাদের এবিষয়ে নাড়ি-নক্ষত্র জেনে নিতে হয়

তারা কুরআনের ভাষা শিখে নেন, এরসাথে যে আধ্যাত্মিকতা আছে তা অনুভব করেনযে কেউ এই বিষয়ে নিজকে সমর্পিত করেন, তিনি এতে হৃদয়ের প্রশান্তির বিষয়টি দেখে অভিভূত হন

এবার কুরআন কপি বা অনুলিপির ব্যাপারে আসা যাকএর লেখন নীতিমালা যাকে আরবিতে রসমুল কুরআন বলেএটা দু'প্রকার

এক. রসমুল উসমানি
দুই. রসমুল ওরশ




ওসমানী রসমের কুরআন

এক. রসমুল উসমানি
আরব বিশ্বের অধিকাংশ দেশসহ পৃথিবীর পূর্ব প্রান্ত পর্যন্ত এ কুরআন পঠিত হয়এটা রেওয়ায়েত বা বর্ণনা করেছেন হাফস ইবনে সুলাইমান ইবনে আল-মুগিরাহ আল-আসাদিইউ আল কুফি
এটার তেলাওয়াত বা পঠনরীতি এসেছে আসেম ইবনে আবি আল-নাজুদ আল কুফি আল-তাবেয়ী আন(থেকে) আবি আবদ আল-রহমান আবদুল্লাহ ইবনে হাবিব আল সুলামিইয়ে আন(থেকে) ওসমান ইবনে আফফান ওয়া(এবং) আলী ইবনে আবি তালেব ওয়া(এবং) যায়েদ ইবনে থাবেত ওয়া(এবং) উবাই ইবনে কা'ব আন(থেকে) আল-নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহে ওয়া সাল্লাম

বর্তমান মদিনা কুরআন কমপ্লেক্স থেকে মুদ্রিত ওসমানি রসমের কুরআন পৃথিবীর প্রায় সবখানে পাওয়া যায়আমার কাছে কয়েকটি কপি আছে বিভিন্ন সময়ে যা ছাপা হয়েছে

কুরআনের শেষ সুরা নাসএর পরের পাতা থেকে রেওয়ায়েত, মুসতলাহাত রসমিহ(লেখন পরিভাষা), দবত(সমন্বয়, যা লিখতে আসে পড়তে আসে না এবং হরকত প্রয়োগের বিধিমালা), আদ্দুআয়িহ( সংখ্যা, চিহ্ন বিষয়ক) আলোচনা আছে
আর আছে আলামাত আল ওক্ফ(যতিচিহ্ন বিষয়ক) আলোচনা এবং কুরআন কমপ্লেক্স কর্তৃপক্ষের ভূমিকা এবং মুদ্রণ সম্পর্কিত তথ্য
পরের পাতায় ফিহরিস(সুরা সুচী)
সবশেষে কাতিব বা অনুলিপিকারের নাম এবং লেখার তারিখ উল্লেখ করা হয়েছে





ওরশ রসমের কুরআন

 
দুই. রসমুল ওরশ
এই রেওয়ায়েতটি ওরশ আন(থেকে) নাফে' করেছেনআফ্রিকার পশ্চিম এবং পশ্চিম-উত্তর এলাকার আরব দেশগুলোতে এ কুরআন পঠিত হয়একে মাগরিবী কুরআনও বলেএর পঠনরীতি কিছুটা আলাদাতবে মূল লেখা একই

অনেকে না জেনে হুট করে বলে বসেন, এই দেখ, কুরআনে কুরআনে কত পার্থক্য! কেউ কেউ নিজের ইচ্ছামত কুরআনের অর্থ করেন! এবং উদ্দেশ্যমূলক বর্ণনা দেন
৪:১৬০- বস্তুতঃ ইহুদীদের জন্য আমি হারাম করে দিয়েছি বহু পূত-পবিত্র বস্তু যা তাদের জন্য হালাল ছিল-তাদের পাপের কারণে এবং আল্লাহর পথে অধিক পরিমাণে বাধা দানের দরুন
৪:১৬১- আর এ কারণে যে, তারা সুদ গ্রহণ করত, অথচ এ ব্যাপারে নিষেধাজ্ঞা আরোপ করা হয়েছিল এবং এ কারণে যে, তারা অপরের সম্পদ ভোগ করতো অন্যায় ভাবেবস্তুত; আমি কাফেরদের জন্য তৈরী করে রেখেছি বেদনাদায়ক আযাব
৪:১৬২- কিন্তু যারা তাদের মধ্যে জ্ঞানপক্ক ও ঈমানদার, তারা তাও মান্য করে যা আপনার উপর অবতীর্ণ হয়েছে এবং যা অবতীর্ণ হয়েছে আপনার পূর্বেআর যারা নামাযে অনুবর্তিতা পালনকারী, যারা যাকাত দানকারী এবং যারা আল্লাহ ও কেয়ামতে আস্থাশীলবস্তুতঃ এমন লোকদেরকে আমি দান করবো মহাপুণ্য


কুরআন মানুষের জন্য অবতীর্ণ হয়েছেআপনি নিজের বৈশিষ্ট্য এতে খুঁজে পাবেন



চলবে-

ছবি- নেট থেকে

রবিবার, ১৫ এপ্রিল, ২০১২

নাম তার পরী....




সন্ধ্যাতারা ডুবে গেছে।

চুমকির মত অজস্র তারার ফুল গাঢ় অন্ধকারে চিকমিক করছে। হঠাৎ হঠাৎ দু'একটা আলোর গোলা সাই করে চলে গেল আকাশ চিরে। চাঁদ উঠতে তখনও বেশ বাকি। তারার রাজ্যে আমি কি যেন খুজে চলেছি।

মামাদের অন্দরের উঠোনটা ছোটখাট একটা দাড়িয়াবাধা খেলার মাঠের মত। আর কাচারির ওপাশে আড়ুইবাজি খেলার মত অনেক বড় সদর আঙিনায় কামলারা ধান মাড়াই করছে ছয়টা গরু হাটিয়ে। ধানের মাতাল গন্ধে ডুবে আছে চারদিক।

আমার ভেতরে কে যেন হু হু করে ওঠে। পশ্চিমের বাশঝাড়ে জোনাকির অবিরাম চোখ টিপে যাওয়া দেখতে দেখতে ঘোর লেগে যাচ্ছে। খেজুরপাতার পাটিতে শুয়ে আছি। বিশ-পঁচিশ হাত দূরে মামি-নানি আর প্রতিবেশী দু'তিন জন মহিলা খোলা চুলোয় পিঠে বানাচ্ছে।

মাথার তলে ফুল তোলা বালিশ থেকে হালকা একটা সুগন্ধ এসে নাকে লাগছে। বালিশটা মনে হয় পরীর। হঠাৎ খেয়াল হল, নিম তলায় বিছানা দিয়ে পরীটা গেল কোথায়?

এখানে বেড়াতে এসে এবার আমার এই কয়দিনের জীবনটা ভাজা ভাজা করে তুলেছে যে দস্যি মেয়েটা। সে হচ্ছে মামাত বোন পরী। আরো একজন আছে, তবে বাশবাড়িয়া খালের বিশাল বাশের সাকো পার হয়ে সে কদাচিৎ হানা দিয়ে যায়। তালুকদারের ডাকাত মেয়ে আমার সে খালাত বোন রোজির কথা আরেকদিন বলবো। আজ শুধু পরীর কথা বলি।

এখানে আসার পর দেখছি পরীর দিন শুরু হয় ফজরের আজানের পর আমাকে চিমটি দিয়ে, চুল টেনে এবং কখনও ধুমাদ্ধুম কিল বসিয়ে ঘুম থেকে ওঠানো। কারণ এ বাড়িতে ফজরের নামাজ পড়া বাধ্যমূলক।

নানারা তিন ভাই। বিশাল বাড়িতে আলাদা চৌহদ্দি তাদের। তাই কাচারি লাগোয়া পাঞ্জেগানা মসজিদে ফজরের জামাতটা ছেলে-বুড়োয় জমজমাট হয়। জামাত শেষে মসজিদের মকতবে পাড়ার ছেলে-মেয়েরা সুর করে কুরান পড়ে। ভোরের মুক্ত বাতাসে ভেসে আসা সেই সুর কেমন অপার্থিব আবহ তোলে। পাখিদের কল-কাকলিতে ধীরে ধীরে জেগে ওঠে চারদিক। গোয়াল ঘরে সদ্য বিয়ানো গরুটা ডাকতে থাকে, কেন তাকে বের করে খড়-পানি দেয়া হচ্ছে না।

পরী মকতব থেকে ফিরে প্রথমেই আমার তত্বতালাশ নেয়। বিছানা গুছাতে গুছাতে নানান প্রশ্ন করে। তার বড়ফুফু কি তার কথা বলে? ফুফুর হাতের খিরসা-পাটি পিঠা তার খুব পছন্দ। এবার ছুটিতে সে খুলনা যাবেই যাবে। ইত্যাদি ধরণের কথাবার্তা। তারপর একবাটি গরম দুধ, খই আর খেজুর গুড় এনে বলে, দাদা খেয়ে নাও। আমার স্কুলের পড়া তৈরি করতে হবে। অংকটা তুমি দেখিয়ে দেবে।

দুই-তিন ঘন্টা পড়া আর গল্প একসাথে চলে। কখনও হঠাৎ উদাস হয়ে জানালা দিয়ে মাঠের দিকে তাকিয়ে থাকে পরী। তারপর কি ভেবে আবার পড়ায় মন দেয়। হুট করে প্রশ্ন ছুড়ে দেয়, দাদা! আমি দেখতে খুব পচা তাই না!
আমি অবাক হয়ে বলি, কেনরে! আমার পরির মত বোনটার আজ একথা মনে এল কি করে!

দ্রুত প্রসঙ্গ বদলিয়ে খুলনা বিষয়ক আলোচনা শুরু করে সে।
আচ্ছা, দাদা! ফুফু মাকে বলেছে, তোমার নাকি ছবি আকার বাতিকটা খুব বেড়ে গেছে? তুমি নাকি কোথায় কোথায় ছবি আকা শিখতে যাও? সেখানে কি মেয়েরা ছবি আকা শেখে? পরীর চোখ সরু হয়ে আসে। তার সন্ধানী চোখ আমার ভেতরটা দেখতে থাকে। আমার অস্বস্তি বেড়ে যায়।

আমি তার ভাব-গতিক বুঝে উঠতে পারি না। পরাজয় এড়াতে বলি, বাদ দে এসব। খুব খিদে পেয়েছে। নাস্তা নিয়ে আয়। পরী মিটমিটে হাসি দিয়ে বলে, ঠিক আছে। নাস্তা খেতে খেতে তোমার ছবি আকার গল্পগুলো শুনবো কিন্তু।

চার-পাঁচদিন হল যশোর থেকে মেজোখালা তার তিন মেয়ে নিয়ে এসেছেন। মাশাল্লা! আনিকা, কনা আর চম্পা- তিন বোন যেন এক একটা সাক্ষাত বিচ্ছু! সারাদিন হই-হাঙ্গামা চলে আর তিন বোনের খাওয়ার ব্যাপারে কোন বাছ বিচারও নেই। কাচা কলা, কাচা পেপে, এমন কি কাচা কদবেলও তারা ছেড়ে দিতে নারাজ। চম্পার আবার দুধের সর খুব পছন্দ। তাই মামির ঘি বানানোর জন্য জমা করে রাখা সর সে হাপিশ করে দিয়েছে। পরী এই ঘটনা বলে আর হাসে। হাসতে হাসতে গড়িয়ে পড়ে।

এত হাসছিস ক্যান!

আমার প্রশ্ন শুনে সে বলে, ওমা! তুমি জানো না! চম্পার পাতলা নামছে। স্যালাইন বানাইতে বানাইতে মেজো ফুফু হয়রান। চম্পার জন্য ডাক্তার আনতে বাজারে গেছেন আব্বা। কয়েকদিনের বাসি সর খেয়েই তো ওর এই দশা হইছে।

দুপুরের কিছুক্ষণ আগে শুয়ে আছি চোখ বুজে। বাইরে প্রচণ্ড রোদ। হঠাৎ কানের কাছে ফিসফিসিয়ে পরী বলল, দাদা, ওঠো। চোখ মেলে তাকিয়ে দেখি এক গ্লাস দুধ হাতে দাড়িয়ে আছে সে। বললাম. সকালেই না একবাটি দিলি! এখন আবার!

চুপ! কথা না বলে খেয়ে নাও। আনিকারা শুনলে ঝামেলা হবে।

আমি মুখে দিয়ে বুঝলাম গাঢ় সরও আছে। আমার জিজ্ঞাসু চোখের দিকে তাকিয়ে কেন যেন লজ্জা পেল পরী। শয়তানি হাসি দিয়ে বললাম, তুই কতদিন এভাবে খাওয়াতে পারবি!

যেন কিছুই হয়নি এমন ভাব করে গ্লাসটা হাতে নিয়ে ঘুরে দাড়াল। চলে যাবে এমন সময় হঠাৎ আমার নাকটাকে নির্দয়ভাবে টান দিয়ে চাপা স্বরে বলল, সারা জীবন। তারপর দৌড়ে পালিয়ে গেল।

আমি ঘটনার আকস্মিকতায় বিমূঢ়। তারপর হঠাৎ মনে হল, হায়! এ কোন জালে জড়িয়ে যাচ্ছি আমি!


চলবে-

------------------------------------
আগের পর্বগুলো-
এক
দুই
তিন
চার
পাঁচ
ছয়


ছবি- নেট থেকে মারিং এণ্ড এডিটিং